https://www.facebook.com/share/1CXwhqtyWm/
post_top_ad

রংপুরের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন

মনোয়ারুল ইসলাম আপন রংপুর জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৪ অপরাহ্ন

শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী উপলক্ষ্যে রংপুরের ঐতিহাসিক ধর্মসভা (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর ২০২৬) দুপুর ১২টা ৫ মিনিটের দিকে রংপুর মহানগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড়ে অবস্থিত ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের রংপুর জেলা শাখার সভাপতি রামজীবন কুন্ডু, মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার রায় এবং মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ।

প্রধানমন্ত্রী মণ্ডপে উপস্থিত ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। ভক্তদের অনুরোধে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন তিনি।

মন্দিরে আয়োজিত শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান-প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সব ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষ সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এই ঐক্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে দেশকে স্বাধীন করার জন্য একসঙ্গে লড়াই করেছেন। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সব ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছেন। একইভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন।

তিনি বলেন, হাজার বছর ধরে এ দেশের মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন। ভবিষ্যতেও যেন তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করতে পারেন, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।

তারেক রহমান বলেন, “এই দেশটি হাজার বছর ধরে সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে এগিয়ে চলছে। শান্তিতে আমরা সকলে মিলে বসবাস করছি। আমরা চাই, আগামী হাজার বছরেও যেন আমরা একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।”

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে দেশকে স্বাধীন করেছেন এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও অংশ নিয়েছেন। প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে হলে সব ধর্ম ও মতের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতেও সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সব মানুষের সরকার হতে চায়-যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁদেরও; যাঁরা ভোট দেননি, তাঁদেরও। সরকারের দায়িত্ব হলো সব এলাকার মানুষের জন্য কাজ করা এবং দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভারসাম্য বজায় রাখা।

তিনি জানান, রংপুর মহানগরীর উন্নয়নে ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে জেলা পরিষদ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রাম ও স্থানীয় পর্যায়ে সেতু-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করতে চায়।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং পারস্পরিক বিভেদ ভুলে দেশের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, অতীতেও বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছিল, যার পরিণতি ভালো হয়নি বলে তিনি মনে করেন। একইভাবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা না করার আহ্বান জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, কারও কোনো বক্তব্য বা দাবি থাকলে তা সংসদে উপস্থাপন করে আলোচনা করা যেতে পারে। জনগণের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান ব্যাহত না হয়, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। দেশের মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করতে চায়।

তিনি আরও বলেন, অতীতের রাজনৈতিক চর্চায় পরিবর্তন আনতে সরকার কাজ করছে; তবে সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নে জনগণই সবচেয়ে বড় শক্তি। এ জন্য জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের শুভ নবমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার কাজে সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। আগামী হাজার বছরও যেন সব ধর্মের মানুষ এ দেশে শান্তিতে বসবাস করতে পারেন, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

মন্দিরের পেছনে হোস্টেলের মতো একটি অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে আর্থিক সহযোগিতার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়ার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার প্রধানমন্ত্রীর হাতে একটি ক্রেস্ট তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী মন্দির কর্তৃপক্ষকে ১০ লাখ টাকার একটি চেক চেক প্রদান করেন।

স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্তু কুমার কুণ্ড, সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ও নিপুণ রায় চৌধুরী, ছাত্রদলের পার্থ দেব, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং রংপুর ধর্মসভার স্বপন কুমার ভট্টাচার্যসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ রংপুরের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বিমানবাহিনীর একটি বিমানে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান সামু, বিভাগীয় কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম, ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকসহ অন্যরা।

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সড়কপথে রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে আয়োজিত দুটি পথসভায় তিনি বক্তব্য দেন। তাঁকে স্বাগত জানাতে সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অবস্থান নেন। গাড়িবহর থেকে হাত নেড়ে তাঁদের শুভেচ্ছা জানান তিনি।

পথসভাগুলোতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করার কথাও তুলে ধরেন।

তারেক রহমান বলেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করতে চায়। দেশের সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশটি সবার; তাই সম্মিলিত পরিশ্রম ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশকে আরও সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সব ধর্মের মানুষ যেমন একসঙ্গে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, তেমনি এখনো সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান-সবাই মিলে দেশের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম রংপুর সফর।

post_bottom_ad