সিলেট বিভাগে অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, ঝুঁকিতে পর্যটকরা
কক্সবাজারে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহতের পর উদ্বেগ | শ্রীমঙ্গলেই শতাধিক রিসোর্ট, অনুমোদনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই
সিলেট বিভাগে পর্যটন খাতের প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, সিলেট ও মৌলভীবাজারের অনেক হোটেল ও রিসোর্টের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। এতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর সিলেট বিভাগের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে হোটেল ও রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই, অনুমোদনের তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট জেলায় হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট মিলিয়ে ৫৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে, মৌলভীবাজার জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় ২০০। এর মধ্যে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলাতেই রয়েছে শতাধিক রিসোর্ট। সব মিলিয়ে সিলেট বিভাগের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পাহাড়, টিলা ও সবুজ প্রকৃতির পাশে গড়ে উঠছে নতুন নতুন অবকাশকেন্দ্র। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কতগুলো অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অন্যান্য আইনগত অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তার সমন্বিত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার ও সিলেটের অনেক রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের অবস্থা স্পষ্ট নয়। তবে ঠিক কতটি প্রতিষ্ঠানের এসব অনুমোদন নেই, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হোটেল ও রিসোর্টের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকায় প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের আগে জমির প্রকৃতি, পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন যাচাই করা জরুরি। শুধু পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা বিবেচনা করে স্থাপনা নির্মাণ করা হলে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শ্রীমঙ্গলে শতাধিক রিসোর্ট
শ্রীমঙ্গল ট্যুরিজম সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এস কে দাস সুমনের হিসাবে, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রায় ১০৩টি রিসোর্ট রয়েছে। তাঁর মতে, রিসোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থাপনার ধরন, সুযোগ-সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
একই সংগঠনের সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ জানান, মৌলভীবাজার জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় ২০০। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গলেই রয়েছে শতাধিক। তবে নামের সঙ্গে ‘রিসোর্ট’ যুক্ত থাকলেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ রিসোর্ট বলা যায় না। কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাকেও রিসোর্ট হিসেবে প্রচারের প্রবণতা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে জেলার রিসোর্টগুলোর মধ্যে কতটি সব ধরনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে সমন্বিত তথ্য স্পষ্ট নয়।
ছাড়পত্র পেয়েছে প্রায় ৬০টি রিসোর্ট
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম রোববার বলেন, তাঁদের দপ্তর থেকে প্রায় ৬০টি রিসোর্টকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ২০টি বা তার বেশি কক্ষ রয়েছে, এমন রিসোর্টের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয় বলে জানান তিনি।
অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ রোববার বলেন, অন্তত ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগের হোটেল ও রিসোর্টের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এর চেয়ে কম বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাঁদের দপ্তর ছাড়পত্র দেয় না। ছাড়পত্র পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্রের পাশাপাশি জমির ব্যবহার, ভবন নির্মাণ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং অগ্নিনিরাপত্তাসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেই সব ধরনের অনুমোদন নিশ্চিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তালিকা তৈরির কথা জানাল প্রশাসন
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, কোথায় কারা রিসোর্ট নির্মাণ করছেন এবং সেগুলো কী ধরনের অনুমতি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। রিসোর্ট স্থাপন ও পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা বা নির্দেশিকা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের জাতীয় পরিষদের সদস্য এ এস এম সালেহ সোহেল বলেন, পাহাড় ও বন কেটে রিসোর্ট তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি নেই। কোথায় এবং কী শর্তে রিসোর্ট নির্মাণ করা যাবে, তা নির্ধারণে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।
সিলেটে ৫৫০টির বেশি হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট
সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সুমত নূরী জুয়েল বলেন, জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী সিলেট জেলায় হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট মিলিয়ে ৫৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তাঁর সংগঠনের ২২ থেকে ২৫টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও কার্যকর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটন খাতের বিকাশের পাশাপাশি পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই সিলেট বিভাগের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোর অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের তথ্য যাচাই করে সমন্বিত তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিদর্শন, নিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিতকরণ এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

