আশা পারেখ: এক জীবনে এক ভালোবাসা, তবু বিয়ের পথে হাঁটেননি
বলিউডের স্বর্ণালি যুগের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী আশা পারেখ। ‘কটি পতঙ্গ’, ‘ক্যারাভান’, ‘তিসরি মঞ্জিল’, ‘লাভ ইন টোকিও’-এর মতো একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। পর্দায় তাঁর হাসি, অভিনয় ও উপস্থিতি ছিল একসময় বলিউডের অন্যতম আকর্ষণ।
কিন্তু পর্দার বাইরের আশা পারেখের জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প। সেখানে খ্যাতি ছিল, ভালোবাসা ছিল, সম্পর্ক ছিল—কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয়নি।
একমাত্র ভালোবাসা নাসির হুসেন
নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বরাবরই অকপট ছিলেন আশা পারেখ। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, পরিচালক নাসির হুসেন ছিলেন তাঁর জীবনের বিশেষ একজন মানুষ এবং তাঁর জীবনের একমাত্র গভীর প্রেম।
তবে সেই সম্পর্ক কখনো বিয়ের পরিণতি পায়নি। কারণ, নাসির হুসেন তখন বিবাহিত ছিলেন। আশা পারেখের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কখনোই অন্য কারও সংসার ভাঙার কারণ হতে চাননি।
এই সিদ্ধান্তই হয়তো তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—ভালোবাসা থাকলেও নিজের নীতির সঙ্গে আপস করতে চাননি তিনি।
কেন বিয়ে করলেন না?
বিয়ে সম্পর্কে আশা পারেখের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল বেশ স্পষ্ট। তাঁর মতে, বিয়ে শুধু ভালোবাসা কিংবা সুখের গল্প নয়; সেখানে পারস্পরিক ছাড়, সমঝোতা ও নিজের স্বাধীনতার কিছুটা বিসর্জনও প্রয়োজন।
কিন্তু নিজের স্বভাবের সঙ্গে সেই সমঝোতার ধারণা সবসময় মানানসই মনে হয়নি তাঁর।
মায়ের পছন্দ করা পাত্রদের সঙ্গে দেখা করার অভিজ্ঞতাও তাঁকে শেষ পর্যন্ত বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী করতে পারেনি। কারও অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিকতা, কারও আচরণ—বিভিন্ন কারণে একসময় বিয়ের ধারণাটিই তাঁর কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
আশা পারেখ মনে করতেন, নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পর্কের তিক্ত অভিজ্ঞতাও প্রভাব ফেলেছিল
সহ-অভিনেতাদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতাও তাঁকে সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়ে ভাবিয়েছে। রাজেশ খান্না কিংবা বিনোদ খান্নার মতো তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম, সম্পর্ক ও দাম্পত্যের জটিলতা কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
সেখান থেকেও হয়তো তাঁর মনে আরও দৃঢ় হয়েছে—জীবনসঙ্গী থাকলেই জীবন সুখী হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাঁর কাছে নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকাটাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও ফিরে আসা
তবে জীবনে একবার বিয়ের সম্ভাবনা বেশ জোরালো হয়েছিল।
এক মার্কিন অধ্যাপকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সম্পর্কটি একসময় বিয়ের দিকেও এগোচ্ছিল। কিন্তু এক রাতে একটি ক্যাফেতে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তাঁর আগে থেকেই আরেকজন প্রেমিকা রয়েছে।
ঘটনাটি আশা পারেখকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপর আর সেই সম্পর্ক এগোয়নি। তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত বিয়ের পথ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন।
‘আক্ষেপ নেই’
জীবনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও কোনো আক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন আশা পারেখ।
একাকিত্বকে তিনি কখনো ভয় হিসেবে দেখেননি। বরং নিজের পছন্দ, স্বাধীনতা ও আত্মসম্মানকে সঙ্গে নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন।
বলিউডের পর্দায় তিনি অসংখ্য প্রেমের গল্পের নায়িকা হয়েছেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁর নিজের গল্পটি ছিল অন্যরকম—সেখানে ভালোবাসা এসেছিল, গভীর সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু বিয়ে আসেনি।
হয়তো এ কারণেই আশা পারেখের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের মতোই মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে আছে।
এক জীবনে এক ভালোবাসা—আর সেই ভালোবাসার স্মৃতিকে সম্মান করে নিজের মতো করে বেঁচে থাকা।
আশা পারেখের জীবনদর্শনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত প্রকাশ হয়তো এভাবেই করা ঠিক বলে আমি মনকরি।

