আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক, এক বছরেই অতিরিক্ত ব্যয় ৪ হাজার কোটি টাকা
উচ্চমূল্য, আর্থিক ক্ষতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন; পরিশোধিত অর্থে তৈরি করা যেত প্রায় ২,১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ
বাংলাদেশের জন্য ভারতের আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি ক্রমেই আর্থিক চাপ ও জ্বালানি নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে। উচ্চমূল্যের পাশাপাশি চুক্তির বিভিন্ন কাঠামোগত শর্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির সর্বশেষ মূল্যায়নে আদানির বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক বাজারদরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি এবং নিকটতম বেসরকারি প্রতিযোগীর তুলনায় ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আদানির কাছ থেকে প্রায় ৮ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রহণ করে। ওই অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা। এতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, একই সময়ে ভারতের অন্যান্য বিদ্যুৎ সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ৫৭ পয়সা। অর্থাৎ অন্যান্য ভারতীয় উৎসের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম ছিল প্রায় ৫ টাকা ৩০ পয়সা বেশি, যা প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি।
এক বছরেই বাড়তি ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা
হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির কাছ থেকে কেনা ৮ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য যদি ভারতের অন্যান্য সরবরাহকারীদের গড় ৯ টাকা ৫৭ পয়সা হারে পরিশোধ করা হতো, তাহলে ব্যয় হতো প্রায় ৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। কিন্তু আদানির ক্ষেত্রে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
ফলে শুধু ওই অর্থবছরেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। তবে পরবর্তী বছরগুলোর সরবরাহ, কয়লার আন্তর্জাতিক মূল্য, ডলারের বিনিময় হার এবং ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে না থাকায় এই হিসাবকে পুরো চুক্তির মেয়াদের মোট অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
আদানিকে দেয়া অর্থে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা
আদানির বিদ্যুতের পেছনে পরিশোধিত অর্থের বিকল্প ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ওই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করা হলে বাংলাদেশ কতটা সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারত, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানিকে পরিশোধ করা প্রায় ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা দিয়ে ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আনুমানিক মূলধনী ব্যয় বিবেচনায় প্রায় ১ হাজার ২৪০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন করা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে ২০২৫ সালের জুনে পরিশোধ করা প্রায় ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা যুক্ত করে মোট প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিবেচনায় নিলে সম্ভাব্য সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হতে পারে। এর গড় হিসাব প্রায় ২ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।
স্থাপিত সক্ষমতার সরাসরি তুলনা নয়
তবে সৌর ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা শুধু মেগাওয়াট দিয়ে সরাসরি তুলনা করা যথাযথ নয়। কারণ সৌরবিদ্যুৎ সূর্যালোকনির্ভর হওয়ায় এর ক্যাপাসিটি ফ্যাক্টর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় কম।
আদানির গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এবং এটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। বিপরীতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন দিনের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে একই স্থাপিত মেগাওয়াট থেকে দুই ধরনের কেন্দ্র সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না।
তবে বিকল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনায় এই হিসাব বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ-ব্যয়ের প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পর জ্বালানি হিসেবে কয়লা বা গ্যাস আমদানির প্রয়োজন না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওঠানামার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
বছরে ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আদানির বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক বাজারদরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে নিকটতম বেসরকারি প্রতিযোগীর তুলনায় মূল্য ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির হিসাবে, এই অতিরিক্ত মূল্যের কারণে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।
ফলে আদানির বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুতের দাম নয়, চুক্তির শর্ত, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

